দিনের আলো তখন ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। পশ্চিমের আকাশে লাল আভা ছড়িয়ে সূর্য ঢলে পড়েছে নিচের দিকে। বারদী শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রমের চারপাশজুড়ে এক অলৌকিক উচ্ছাস ও গাঢ় ভক্তির পরিবেশ। সবার দৃষ্টি প্রদীপের সলতে আর আশ্রমের ঘড়ির কাঁটার দিকে, কখন বাজবে সন্ধ্যার ঘণ্টা।

কার্তিক মাসের শেষ পাক্ষিকের প্রথম দিনেই এ বছর পরম শ্রদ্ধায় শুরু হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘রাখের উপবাস’। যা কারও কাছে ‘কার্তিক ব্রত’, কারও কাছে ‘গোসাইর উপবাস’ কিংবা ‘ঘৃত প্রদীপ প্রজ্বালন’ উৎসব হিসেবেও পরিচিত। আগামী ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার ঘটা করে পালিত হবে এই প্রার্থনা উৎসব।

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার বারদী শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রমের ‘রাখের উপবাস’ উৎসবকে কেন্দ্র করে দেখা মিলে এক আবেগঘন পরিবেশ। আশ্রমের  বাইরে সারিবদ্ধ ভ্রাম্যমাণ দোকান। সেখানে মিলছে ধূপদানি, মাটির প্রদীপ আর খাঁটি ঘি। পাশে মিষ্টির দোকানগুলোতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে সন্দেশ, নারকেল নাড়ু ও নানান পদের নৈবেদ্য।

মন্দিরের প্রধান ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে এক অপরূপ দৃশ্য। আশ্রমের প্রধান ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল এক অভাবনীয় দৃশ্য। হাজারো ভক্ত সারি বেঁধে নিজ নিজ জায়গায় বসে প্রদীপের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কলার খোলে পরম মায়ায় সাজানো হয়েছে মাটির দিয়া। তাতে খাঁটি ঘি ঢেলে সলতে বসিয়ে অপেক্ষা চলছে পবিত্র সেই মুহূর্তের।

হঠাৎ বেজে উঠল সন্ধ্যার কাঙ্ক্ষিত ঘণ্টা! মুহূর্তের মধ্যে হাজারো ঘিয়ের প্রদীপ একসাথে জ্বলে উঠল। সঙ্গে উলুধ্বনি আর কাঁসরের শব্দে কেঁপে উঠল পুরো আশ্রম। শাঁখের আওয়াজ আর ধূপের ঘ্রাণযুক্ত ধোঁয়া চারপাশের বাতাসকে করে তুলল স্নিগ্ধ ও পবিত্র। ভক্তরা চোখের জল আর একাগ্ৰতায় মগ্ন হলেন বাবা লোকনাথের আরাধনায়, পরিবার-পরিজনের শান্তি, সমৃদ্ধি ও সুস্বাস্থ্যের আকুল প্রার্থনায়।

আশ্রম কর্তৃপক্ষ থেকে জানা যায় , উনবিংশ শতাব্দীতে সোনারগাঁয়ে যখন প্রাণঘাতী কলেরা ও বসন্তের মারাত্মক প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল, তখন পরমপুরুষ বাবা লোকনাথ রোগমুক্তির পথ হিসেবে কার্তিক মাসে উপবাস রেখে আশ্রম প্রাঙ্গণে প্রদীপ ও ধূপ জ্বালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই থেকে রোগ-ব্যাধি থেকে বাঁচার আকুতি ও পরিবারের সুরক্ষায় প্রতিবছর কার্তিক মাসের শেষ ১৫ দিনের শনি ও মঙ্গলবার সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এই ব্রত পালন করে আসছেন।

ব্রতের আগের দিন থেকে ভক্তদের সংযম পালন করতে হয়। পরদিন সারাদিন উপবাস থেকে সন্ধ্যার ঠিক আগে ধূপ ও প্রদীপ নিয়ে বসতে হয় আরাধনায়। একাগ্রচিত্তে প্রার্থনার পর ঘিয়ের প্রদীপ নিভে গেলে প্রসাদ বিতরণের মাধ্যমে ভাঙা হয় উপবাস। সবশেষে সারিবদ্ধভাবে প্রার্থনার উপকরণগুলো কাছের নদীর জলে বিসর্জন দেওয়ার মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটে রাখের উপবাসের।

কুমিল্লা থেকে আসা ভক্ত মিনা রানী দাস প্রদীপের দিয়াতে ঘি ঢালতে ঢালতে বলছিলেন, বাবার চরণে এসেছি পরিবারের সবাইকে ভালো রাখার প্রার্থনা নিয়ে। এখানে এলে সব কষ্ট দূর হয়ে যায়।

এই উৎসবের রূপ শুধু দেশীয় ভক্তদেরই নয়, টেনে এনেছে বিদেশী অনুরাগী ও পর্যটকদেরও। নেপাল থেকে আসা  এক পর্যটক রাসাইল, তন্ময় হয়ে দেখছিলেন হাজারো আলোর এই মিলনমেলা। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে তিনি জানান, রাখের উপবাসের এই আয়োজন আর বাংলাদেশের এই অপূর্ব লোকজ সংস্কৃতি আমার ভীষণ পছন্দের। এত সুন্দর ও গভীর প্রার্থনাময় মুহূর্ত কাছ থেকে উপভোগ করতেই এবার এখানে ছুটে এসেছি।

আশ্রমের প্রধান পুরোহিত প্রাণেশ চক্রবর্তী এই আয়োজনের তাৎপর্য তুলে ধরে বলেন, উনবিংশ শতাব্দীতে কলেরা ও বসন্তের মতো মহামারীর হাত থেকে মুক্তি পেতে বাবা লোকনাথের নির্দেশেই এই রাখের উপবাসের সূচনা হয়েছিল। আজও সেই বিশ্বাসে অটল থেকে সুস্বাস্থ্য ও পরিবারের সুরক্ষার আশায় হাজার হাজার ভক্ত এই ঐতিহ্যবাহী ব্রত পালন করে আসছেন।

রাতের আঁধার ধীরে ধীরে গভীর হয়। নদীজলে ভেসে যাওয়া প্রদীপের সলতেগুলোর মতো ভক্তদের হৃদয়ের প্রার্থনাও ছড়িয়ে পড়ে বারদীর শান্ত বাতাসে।