গার্মেন্টসে বেতন বাড়ালেই ব্যবসায় লস, অর্ডার ক্যানসেল, কারখানা বন্ধ করে দিতে হবে—এই বাস্তবতার ভিত্তি কতটুকু?
শ্রমিকের বেতন বাড়ানোর প্রসঙ্গ এলেই মালিকপক্ষের জন্য একধরনের ভয়ভিত্তিক ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়। অর্ডার নেই, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, উৎপাদন খরচ বেশি, কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে ইত্যাদি।
অথচ শিল্পের মুনাফা ও ব্যয়ের কাঠামোতে যে অনৈতিক সুবিধা, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের জায়গা রয়েছে, সেগুলো নিয়ন্ত্রণের আলোচনা খুব একটা সামনে আসে না। মাত্র দুটি হিসাব বুঝলেই এই ন্যারেটিভের অনেকটা যাচাই করা সম্ভব।
প্রথম হিসাব: অনৈতিক ব্যয় ও চাঁদাবাজি। ধরুন, একটি কারখানায় ১,০০০ শ্রমিক কাজ করেন। প্রত্যেকের বেতন ৫,০০০ টাকা বাড়াতে হলে মালিকপক্ষের মাসিক অতিরিক্ত ব্যয় হবে ৫০ লাখ টাকা। বছরে ৬ কোটি টাকা।
এবার বণিক বার্তার ১৩ আগস্ট ২০২৪-এর প্রতিবেদনটি দেখুন। প্রতিবেদনে বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেছেন, চাঁদাবাজিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে ব্যবসার পরিচালন ব্যয় ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
ভাবুন, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি বন্ধ করেই যদি পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর সুযোগ থাকে, তাহলে কাস্টমসের অনিয়ম, ঘুষ, প্রশাসনিক হয়রানি এবং অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুফল কতটা হতে পারে?
আরেকটি বিষয়, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও সিন্ডিকেটের কারণে মালিকপক্ষ অনেক সময় স্বাধীনভাবে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না বলে অভিযোগ রয়েছে। যেমন, জুট বিক্রির ক্ষেত্রে বাজারদরের চেয়ে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ার অভিযোগ। এসবের প্রমাণভিত্তিক হিসাব ও প্রতিকার নিয়ে আলোচনা কোথায়?
দ্বিতীয় হিসাব: মালিকপক্ষের ব্যয় ও করব্যবস্থার স্বচ্ছতা। ব্যবসায়িক সফর, আপ্যায়ন, উপহার, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সুবিধা—কোনটি প্রকৃত ব্যবসায়িক ব্যয়, আর কোনটি ব্যক্তিগত ভোগের ব্যয়, তার স্বচ্ছ হিসাব থাকা জরুরি।
ব্যবসার নামে ব্যক্তিগত ব্যয় দেখানো, করযোগ্য আয় আড়াল করা কিংবা কর ফাঁকির সুযোগ বন্ধ করা গেলে শিল্পের আর্থিক সক্ষমতায় কী পরিবর্তন আসতে পারে, সেই হিসাব কি কখনো প্রকাশ্যে এসেছে?
ধরুন, একটি ১,০০০ শ্রমিকের কারখানায় অপ্রয়োজনীয় ও অনিয়মিত ব্যয় থেকে মাসে ২০ লাখ টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব হলো। সেটি প্রতি শ্রমিকের জন্য মাসে ২,০০০ টাকা অতিরিক্ত মজুরি দেওয়ার সমান। এটি বাস্তব সাশ্রয়ের দাবি নাহ, হিসাবের উদাহরণ মাত্র। প্রকৃত সক্ষমতা জানতে নিরীক্ষিত হিসাব প্রয়োজন।
এবার মূল প্রশ্নে আসি। শ্রমিক কোনো দয়া বা অনুদান চাইছেন না। তিনি তাঁর শ্রমের ন্যায্য মূল্য চাইছেন। যে হাত দিয়ে তিনি প্রতিদিন রপ্তানির জন্য পোশাক তৈরি করেন, সেই হাতের উপার্জনে নিজের পরিবারকে ন্যূনতম স্বস্তি দেওয়ার অধিকারও তাঁর আছে।
শিল্প বাঁচুক, ব্যবসা টিকে থাকুক—এটা শ্রমিকেরও স্বার্থ। কিন্তু শিল্প টিকিয়ে রাখার সব দায় কি শুধু শ্রমিকের কম মজুরি দিয়ে মেটাতে হবে? মালিকের মুনাফা, পরিচালন ব্যয়, অনিয়ম ও অপচয়ের হিসাবও কি আলোচনায় আসবে না? শ্রমিকের পেটের ভাতকে শিল্পের লোকসান হিসেবে উপস্থাপন করার আগে শিল্পের প্রতিটি টাকার হিসাব প্রকাশ করুন।










