নারায়ণগঞ্জ শহরের কোলাহল ও শীতলক্ষ্যার ওপার ঘেঁষে বন্দর উপজেলার রাজবাড়ি এলাকা। চারপাশ ঘিরে শত শত তৈরি পোশাক ও শিল্পকারখানা। কারখানায় কর্মরত হাজার হাজার নারী শ্রমিকের দিনরাত ঘাম ঝরানো পরিশ্রমই দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখছে। কিন্তু দিনশেষে এই লড়াই করা নারীদের ফিরতে হয় স্যাঁতসেঁতে, ঘিঞ্জি আর নিরাপত্তাহীন ভাড়া ঘরে। তবে সেই চিত্র শীঘ্রই বদলাতে শুরু করবে।

শ্রমজীবী নারীদের নিরাপত্তাহীনতা দূর করতে এবং অল্প খরচে উন্নত জীবনের স্বাদ দিতে নারায়ণগঞ্জে নির্মিত হয়েছে নয়তলা বিশিষ্ট আধুনিক শ্রমজীবী মহিলা হোস্টেল। শ্রম অধিদপ্তরের নিজস্ব ৪৫.৬৮ শতাংশ জমিতে প্রায় ৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই ভবনটি যেন অসহায় ও স্বল্প আয়ের নারী শ্রমিকদের জন্য এক টুকরো ‘ফাইভ স্টার’ স্বস্তি।

শ্রম কল্যাণ কেন্দ্র সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের ৭ জুলাই এই হোস্টেলের নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ২০২৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর এর নির্মাণ সম্পন্ন হয়। প্রায় ৭৯,৬৪৮ বর্গফুটের বিশালাকার এই ভবনে রয়েছে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা।

কী আছে এই আধুনিক ভবনে?

বাইরে থেকে দেখতে দৃষ্টিনন্দন নয়তলা এই ভবনের ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে পরিচ্ছন্ন ও সুরক্ষিত পরিবেশ। নারী শ্রমিকদের জন্য এতে রাখা হয়েছে: প্রশস্ত কক্ষ ও হলরুম। এখানে একক সিঙ্গেল রুম ২৪টি, ডাবল বেডের রুম ৮টি এবং চার বেডের রুম ১৪২টি। সব মিলিয়ে ১৭৪টি কক্ষে সর্বমোট ৬০৮ জন নারী শ্রমিক থাকতে পারবেন।

হোস্টেলে রয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ও চিকিৎসাসেবা। সার্বক্ষণিক সিসি ক্যামেরা সহ নিরাপত্তা ব্যবস্থা, প্রতিটি ফ্লোরে রয়েছে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, জরুরি চিকিৎসাসেবার জন্য থাকছে পাঁচ শয্যার হাসপাতাল। এছাড়াও উন্নত মানের ক্যান্টিন সুবিধা এবং সুব্যবস্থাসম্পন্ন লন্ড্রি সার্ভিস, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ সহ বিনোদনের ব্যবস্থা।

নামমাত্র ভাড়ায় রাজকীয় সুযোগ

যেখানে নারায়ণগঞ্জ বা আশেপাশের এলাকায় সাধারণ একটি ছোট ঘর ভাড়া নিতে হাজার হাজার টাকা গুনতে হয়, সেখানে এই হোস্টেলে চার বেডের বা দুই বেডের রুমে প্রতি সিটের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ১,০০০ টাকা। আর একক সিঙ্গেল রুমের জন্য ভাড়া রাখা হয়েছে ২,০০০ টাকা।

কেবল প্রাতিষ্ঠানিক কারখানার শ্রমিকই নন, নির্দিষ্ট শর্তাবলি মেনে যেকোনো কর্মজীবী নারী শ্রমিকই এই হোস্টেলে সিট বরাদ্দ নিতে পারবেন। আবেদনের জন্য শ্রম অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট বা হোস্টেল কার্যালয় থেকে সরাসরি ফর্ম সংগ্রহ করা যাবে।

আশেপাশের হাজার হাজার নারী শ্রমিকের ভরসা

সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হোস্টেলটির চারপাশে ২১৪টি কারখানা রয়েছে, যেখানে কাজ করছেন ১৪ হাজার ৩৩৮ নারী শ্রমিক। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই বিপুল সংখ্যক নারী শ্রমিককে টার্গেট করে প্রচারণা চালানো হলে তাঁদের আবাসন সংকট অনেকাংশে কেটে যাবে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ শহরের নারী শ্রমিকরা নদী পার হয়ে খুব সহজেই স্বল্প দূরত্ব ও স্বল্প খরচে এখানে এসে থাকতে পারবেন।

স্বস্তির নিঃশ্বাস নারী শ্রমিকদের কণ্ঠে

বন্দরের ইপিলিয়ন নিটওয়্যারস লিমিটেডে কর্মরত নারী শ্রমিক ফাতেমা নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের মধ্যে অনেকেই গ্রাম থেকে এসে শহরে চাকরি করি। কিন্তু থাকার মতো ভালো ও নিরাপদ জায়গা পাই না। দু-একটা পাওয়া গেলেও খরচ অনেক বেশি। এত অল্প খরচে এতো ভালো সুযোগ-সুবিধায় থাকতে পারা আমাদের মতো শ্রমিকদের জন্য অনেক বড় বিষয়। সরকার আমাদের জন্য এমন একটা ভালো থাকার জায়গার ব্যবস্থা চালু করায় তাদের অনেক ধন্যবাদ।

অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাবের আশা

নারী শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং তাদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিই এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য বলে জানিয়েছেন বিভাগীয় শ্রম দপ্তরের পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে বলেন, বর্তমান সরকার শ্রমজীবী নারীদের আবাসন সংকট দূর করতে এই হোস্টেল চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে। এখানে নারী শ্রমিকরা নিরাপত্তার পাশাপাশি আধুনিক জীবনযাত্রার সুযোগ-সুবিধা পাবেন। থাকার ভালো পরিবেশ পেলে তাঁদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে, যা তাঁদের কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। ফলস্বরূপ এই ইতিবাচক প্রভাব আমাদের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের গতি বৃদ্ধি করবে এবং জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে।