চারিদিকে ঢাকের বাদ্য, শঙ্খের ধ্বনি আর আনন্দ-উচ্ছ্বাসের জোয়ার। পূজা মণ্ডপের রঙিন আলোয় ঝলমল করছে নারায়ণগঞ্জ শহর। অথচ শহরের কোলঘেঁষা নয়ামাটি এলাকার একটি ঘরে পূজার কোনো আমেজ নেই। দুর্গাপূজার এই আনন্দের দিনেও সেখানে নেই কোনো উৎসব। শারদীয় দুর্গোৎসবের আমেজ সেই ঘরের দরজায় এসে আটকে যায়, দরজার ওপাশে কেবল দীর্ঘশ্বাস আর নীরব ক্রন্দন।

এই ঘরে আনন্দ থাকার কথা ছিল। প্রথম শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী রিয়া গোপের বয়স কতই বা আর হয়েছিল! ২০২৪ সালের জুলাইয়ের সেই উত্তাল দিনগুলোতে কৌতূহলী শিশুমন নিয়ে যে মেয়েটি ছাদে গিয়ে বুলেটবিদ্ধ হয়েছিল, আজ এই পূজায় তারই অনুপস্থিতি পুরো পরিবারকে স্তব্ধ করে রেখেছে।

ঘরের ভেতর প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে একরাশ শূন্যতা। দেয়ালে ঝোলানো রিয়ার মিষ্টি হাসির ছবিটিও আজ আর সেখানে নেই। রিয়ার মা বিউটি ঘোষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য চিকিৎসকের  পরামর্শ, চোখের সামনে মেয়ের কোনো স্মৃতি রাখা যাবে না। একমাত্র সন্তানের কোন স্মৃতি দেখলেই বুক ফেটে কান্না আসে মায়ের। তাই বাধ্য হয়েই মেয়ের ব্যবহৃত সমস্ত জামাকাপড়, খাতা-কলম আর ছবি সরিয়ে রাখা হয়েছে চোখের আড়াল থেকে।

কিন্তু ছবি সরালেও কি মনের ভেতর থেকে কি মোছা যায় সেই ছোট্ট মুখখানি? অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বিউটি ঘোষ বলেন, ‘ছবি সরাইয়া কি আমার মেয়েকে ভুলাইতে পারব? পূজায় আর কি আনন্দ হবে, বুকটা আমার খালি! কী সুন্দর করে ডাকত আমারে—‘বিতিমা, ঘরে আসো, ঘরে আসো’।’

মেয়ের স্মৃতি হাতড়াতে হাতড়াতে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা। বলতে থাকেন, ‘পূজার সময় সন্ধ্যা হইলেই আমারে মণ্ডপে নিয়া যাইতে বলত। কারো জন্য অপেক্ষা করতাম না, মা-মেয়ে রেডি হয়ে বের হয়ে যেতাম। আমি মণ্ডবে বসতাম, আর রিয়া ঢাকের তালে তালে নাচত। আমার এত বড় মাইয়াটা নাই! বেঁচে থাকলে আজ কত বড় হয়ে যেত…।’

রিয়ার বাবা দীপক কুমারও যেন বাকরুদ্ধ। উৎসবের এই দিনগুলোতে যেখানে পরিবারের সবার একসাথে আনন্দ করার কথা, সন্তানহারা এই পিতা নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেন না। বিউটি ঘোষ বলেন, ‘সবাই পূজার বন্ধে ঘরে থাকে, সে থাকে না। রিয়ার বাবা প্রায়ই বলে, আমার ভালো লাগে না ঘরে থাকতে। আজ সকালেও চোখের পানি ফালাইছে। আমরা ঘরে বইসা কেবল বোবাকান্না করি।’

২০২৪ সালের ১৯ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে যখন নারায়ণগঞ্জেও রণক্ষেত্র পরিস্থিতি, তখন বাড়ির চারপাশের গোলাগুলির শব্দ শুনে কৌতূহলবশত ছাদে গিয়েছিল ছোট্ট রিয়া।  তাকে আনতে ছাদে চলে যান  বাবা দীপক কুমার। মেয়েকে কোলে তুলে নেওয়ার মুহূর্তেই একটা বিকট শব্দ—আর তাতেই সব শেষ। মাথায় বুলেটবিদ্ধ হয়ে বাবার কোলেই ঢলে পড়ে শিশু রিয়া। হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ২৪ জুলাই চিরদিনের মতো না ফেরার দেশে চলে যায়। স্বজন হারানোর এই বেদনা কাটিয়ে ওঠার নয়।

রিয়াকে হারানোর পর যখন শোকের সাগরে ডুবে ছিলো পুরো পরিবার, তখন বিচারের প্রক্রিয়াও আটকে ছিল অনিশ্চয়তায়। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর দীর্ঘ ১১ মাস পর পুলিশের পক্ষ থেকেই দায়ের করা হয় মামলা। নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবু রায়হান বাদী হয়ে মামলাটি করেন।

তবে ত্যাগের এই ইতিহাস মুছে যায়নি। শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে জুলাই গণ-অভ্যুত্থাণ স্মৃতি জাদুঘর প্রকাশ করেছে চব্বিশের অভ্যুত্থানে সনাতন শহীদদের আত্মত্যাগ নিয়ে লেখা বই ‘বিসর্জন: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সনাতন শহীদেরা’। সেই বইয়ের পাতায় অমর হয়ে আছেন শিশু রিয়া গোপ সহ ৯ জন শহীদ।

মণ্ডপে মণ্ডপে দেবীকে বিদায় জানানোর জন্য যখন বিসর্জনের প্রস্তুতি চলে, তখন রিয়া গোপের পরিবারের কাছে সেই বিসর্জন প্রতিদিনের, প্রতি মুহূর্তের।  রিয়ার নাম লেখা থাকবে ইতিহাসের পাতায়, কিন্তু রিয়ার মায়ের শূন্য কোণে যে হাহাকার জমে আছে, তার কোনো উপশম যেন এই উৎসবের আলোতেও নেই।