নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সবার আগে প্রার্থী ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এই পদের জন্য দলটি মনোনীত করেছে নারায়ণগঞ্জ মহানগর জামায়াতের আমীর মাওলানা আবদুল জব্বারকে। তার চেয়েও বড় পরিচয় হচ্ছে আবদুল জব্বার ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি।

সবশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবদুল জব্বার নারায়ণগঞ্জ ৪ আসনে সংসদ সদস্য প্রার্থী ছিলেন। শেষ সময়ে তাকে স্থান ছেড়ে দিতে হয় জোটের প্রার্থী এনসিপির আব্দুল্লাহ আল আমিনকে। তবে হতাশ করেননি আল আমিন। তার গুছিয়ে রাখা আসনে জয় ছিনিয়ে এনেছেন তিনি। তবে নারায়ণগঞ্জের বাকি সবগুলো আসনে জয় পেয়েছে বিএনপির প্রার্থীরা।

জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ হারাতেই আবদুল জব্বার মনোযোগ দিয়েছেন সিটি নির্বাচনে। কোমড় বেধে নেমেছেন গণসংযোগে। প্রায় প্রতিদিনই নাসিকের বিভিন্ন ওয়ার্ড চষে বেড়াচ্ছেন এবং কর্মসূচী পালন করছেন। গণসংযোগ ও প্রচার প্রচারনায় সবার আগে এগিয়ে আছেন তিনি।

জামায়াত নেতাদের কাছে হিসেবটা বেশ সহজ। জাতীয় নির্বাচনে সিদ্ধিরগঞ্জ এবং বন্দরে ভালো ফলাফল করেছে জোটের প্রার্থীরা। শহরে কিছুটা বেকায়দায় ছিলেন তারা। সিটি নির্বাচনে সিদ্ধিরগঞ্জ ও বন্দরের ভোটে এগিয়ে থাকবে তাদের প্রার্থী এমনটাই ভাবছেন শীর্ষ নেতারা। প্রয়োজন অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন।

এদিকে গণঅভ্যুত্থানে জন্ম নেয়া জাতীয় নাগরিক পার্টি স্থানীয় নির্বাচনে আলাদাভাবে অংশ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিন সিটির পর এবার নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী ঘোষণা করতে যাচ্ছে তারা। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দিলেও ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে দলটির রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য এবং যুগ্ম আহবায়ক আলী আহসান জুনায়েদের নাম। অথচ বহু আগে থেকেই এই পদে প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় ছিলেন মহানগর এনসিপির আহবায়ক ও কেন্দ্রীয় সহ সাংগঠনিক সম্পাদক শওকত আলী।

কে এই জুনায়েদ?

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে প্রশ্ন উঠেছে কে এই জুনায়েদ। কিসের ভিত্তিতে এনসিপি তাকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মত বড় পদে প্রার্থী করলো? যেখানে নারায়ণগঞ্জে রাজনীতির কোন ইতিহাসই নেই তার। এমনকি ৫ আগস্টের পরেও তাকে সরব থাকতে দেখা যায়নি এই জেলায়।

এনসিপির সূত্র বলছে, আলী আহসান জুনায়েদ নারায়ণগঞ্জে রাজনীতি না করলেও তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন লম্বা সময় ধরে। তার পৈত্রিক নিবাস নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়। তার বাবা আবু মোকাররম মোহাম্মদ মুসা ছিলেন স্কুল শিক্ষক। তবে পুরো পরিবারই সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার হাউজ আবাসিক এলাকায় বসবাস করতেন।  পরবর্তীতে সিদ্ধিরগঞ্জের ভূমিপল্লী এলাকায় স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেন।

জুনায়েদ ছিলেন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড মাধ্যমিক স্কুলের ছাত্র। স্কুল জীবন থেকেই যুক্ত ছিলেন ইসলামী ছাত্র শিবিরের রাজনীতিতে। পরবর্তীতে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজে স্নাতক ও স্নাতোকোত্তর সম্পন্ন করেন। নিজ ডিপার্টমেন্টে সেকেন্ড স্থান অর্জন করে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে।

ঢাবিতে অধ্যয়নরত অবস্থাতেই ২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র শিবিরের সভাপতির দায়িত্ব লাভ করেন। এর মাধ্যমে ফ্যাসিবাদ বিরোধী শীর্ষ রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের সাথে তার সম্পর্ক তৈরী হয়।

এছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সম্মুখসারীর নেতাদের অন্যতম ছিলেন জুনায়েদ। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ইসলামী ছাত্র শিবিরের রাজনীতি থেকে বিদায় নিয়ে যুক্ত হন জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপিতে। বর্তমানে তিনি দলটির নীতিনির্ধারনী পর্ষদের অন্যতম সদস্য।

জুনায়েদে চিন্তার ভাঁজ জামায়াতে

আলী আহসান জুনায়েদের নাম উচ্চারিত হতেই দুশ্চিন্তার ভাঁজ তৈরী হয়েছে জামায়াত বলয়ে। একদিকে জুনায়েদ ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক শীর্ষ নেতা। অন্যদিকে তিনি নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা। ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক ও বর্তমান অনেক নেতাকর্মী জুনায়েদের ভক্ত। সেই সাথে জুলাই অভ্যুত্থানে তার নেতৃত্বে কর্মসুচী পালন করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাদের।

একদিকে নিজেদের সাবেক নেতা। অন্যদিকে নিজ জেলার বাসিন্দা। বিপরীতে আবদুল জব্বার বেশ আগের কেন্দ্রীয় নেতা। সেই সাথে তিনি নারায়ণগঞ্জের আদি বাসিন্দা নন। ফলে জুনায়েদের উপস্থিতি ভোট ব্যাংক ও দৃঢ় সমর্থনে ভাগ বসাতে পারে এমনটা ভাবছেন অনেকেই।

যেই পরিকল্পনায় হাঁটছে এনসিপি

দলটির একাধিক সূত্র জানায়। জামায়াত স্থানীয় নির্বাচনে ছাড় দিতে নারাজ। নিজেদের ভোট ব্যাংক নিয়ে অধিক আত্মবিশ্বাসী তারা। এমন অবস্থায় এনসিপি শক্ত প্রার্থী দাঁড় করিয়ে জামায়াতকে নিজেদের সক্ষমতা দেখাতে প্রস্তুত। সেই পরিকল্পনা থেকেই নাসিক নির্বাচনে জামায়াতের কপালে চিন্তার ভাঁজ এনে দিতে পারে এমন প্রার্থী দাঁড় করাচ্ছে দলটি।

এদিকে শওকত আলীকে বাদ দিয়ে আলী আহসান জুনায়েদের নাম সামনে আসায় তৃণমূলের অনেকেই ক্ষুব্ধ। তবে তাদের বড় অংশই এই পরিকল্পনা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন। ইতোমধ্যে সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াকে ঢাকা দক্ষিন থেকে সরিয়ে ঢাকা উত্তরে প্রার্থী করা হয়েছে। ঢাকা দক্ষিনে নামানো হয়েছে নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারীকে। তেমনি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনেও শওকত আলীর বদলে আলী আহসান জুনায়েদকে নামাতে যাচ্ছে এনসিপি।

দলটির নেতাকর্মীরা বলছেন, ‘জুনায়েদের বর্তমান পরিচিতি থাকা জরুরী না। কারন অল্প সময়ে মাঠে সঠিক রাজনীতি এবং আস্থা অর্জন করে চমক দেখিয়েছেন এনসিপির এমপি আব্দুল্লাহ আল আমিন। ঠিক একই প্রক্রিয়ায় আলী আহসান জুনায়েদ হাটতে পারলে সিটি নির্বাচনে চমক দেখাতে পারবেন তিনি। জয় পরাজয়ের চাইতে এই শহরের রাজনীতিতে নিজের অবস্থান গড়ে তোলার সক্ষমতা অর্জনকেই বেশী প্রাধান্য দিচ্ছেন তারা।